এই মুহূর্তে
Home > Flash > রূপা মন্ডল -এর একটি গল্প ‘নতুন পেশা’

রূপা মন্ডল -এর একটি গল্প ‘নতুন পেশা’

নতুন পেশা

রূপা মন্ডল

(১)

যখন উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছিলাম তখন থেকেই আমার চাকরি খোঁজা শুরু। কিন্তু চাকরি বললেই তো মেলে না, অগত্যা টিউশন পড়িয়ে রোজগার করতে শুরু করলাম। কারণ বাবা আর সংসারটা চালাতে পারছিল না। একসময় একটা বড় ফ্যাক্টরীতে  চাকরি করতেন। তখন আমাদের কি সুন্দরভাবে সংসার চলছিল! হটাত শ্রমিকদের দাবি মেটাতে না পারায় এবং ফ্যাক্টরী লসে রান করায় কোম্পানি লক আউট করে দেয়। বাবার কাছে শুনেছি যে এই লক আউটের জন্য কর্মচারীরাও অনেকখানি দায়ী ছিল। তারা গাছ বাঁচিয়ে রেখে ফল খেতে শেখে নি। উতপাদনের  থেকে দাবি আদায়েই বেশী ছিল তাদের উতসাহ।

কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে বাবা একটা চায়ের দোকান খুললেন। মা বাড়িতেই সেলাই মেশিনে সারাদিন সেলাই করত। রান্না আর ঘরের সব কাজ করত আমার দিদি। দিদি মাধ্যমিক অবধি পড়াশোনাটা টেনে গিয়েছিল, কিন্তু শেষ অবধি পাশ করতে পারে নি! তারপর থেকে বাড়িতেই থাকত, আর ঘরের কাজকর্ম করত। আমার যখন কুড়ি বছর বয়স দিদির তখন একজন কারখানার শ্রমিকের সাথে বিয়ে হ’ল। দিদির তখন বাইশ বছর বয়স। তারা পণ হিসেবে অনেক কিছু চেয়েছিল – খাট, আলমারি, সাইকেল, টিভি, সোনার আংটি আর মেয়েকে দিতে হবে পাঁচভরি সোনার গহনা। বাবা অনেক টাকা ধারদেনা করে দিদিকে পাড় করেছিল।

যাওয়ার সময় দিদি আমার হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে গিয়েছিল,

– বাবা-মাকে দেখিস। মায়ের খুব কষ্ট হবে রে! একা হাতে সংসারের সব কাজ সামলাতে হবে!

(২)

আমি তখনও কোন চাকরি যোগাড় করতে পারি নি। বাড়িতে অভাব অনটন যেন আরো বেড়ে চলল। দিদির বিয়ের দেনা শোধ করার জন্য বাবা-মাকে রাতদিন পরিশ্রম করতে হচ্ছিল। মা রাত জেগে সেলাই করতে শুরু করল।

বিয়ের মাসখানেক পরে একদিন দিদি আমাকে আমার বন্ধু নীলুর ফোনে ফোন করে জানালো ওর শ্বাশুড়ী আর শ্বশুড়মশাই উঠতে  বসতে ওকে কথা শোনায়, জামাইবাবু মারধরও করে। বলে, আমাদের নাকি চোখের চামড়া নেই, তাই এমন খেলো জিনিস বিয়েতে দিয়েছি। শুনে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল!

সেদিন বিকেলে এক ছাত্রের বাড়ি গিয়ে দেখলাম তারা বাড়ি নেই। অতএব বিকালে কোন কাজ ছিল না আমার। এই কয়েক ঘন্টা শ্বাস নিতে পারব বোধহয়!  গতকাল দিদির ফোনটা পাওয়ার পর থেকেই মনটা খারাপ হয়ে আছে। পর্যন্ত বিকেলের আঁচে বেশ গরম লাগছিলো | আমি বাচ্চুদের রোয়াকে একা একাই বসে ছিলাম, হটাত সুবলের সাথে দেখা হয়ে গেল। সাইকেল নিয়ে যেতে যেতে আমাকে দেখে থমকে দাঁড়াল –

– আরে তুই এখানে?

– হ্যাঁ ভাই, এই বসে আছি। ছাত্র আজ বাড়ি নেই, তাই।

– ও টিউশন করিস বুঝি? আমি ভাবলাম কোথাও চাকরি করিস বোধহয়।

– চাকরি আর দিচ্ছে কে?

– সবাই কি আর চাকরি করে? অন্য কিছুও করতে পারিস!

বলে কেমন যেন একটা মুচকি হাসল। তারপর নিজে একটা সিগারেট ধরিয়ে আমার দিকে একটা বাড়িয়ে দিলো। আমি ব্যাপারটা বুঝে উঠতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম,

– মানে?

সিগারেটের ধোঁয়ার রিং ছড়িয়ে দিয়ে সুবল বলল,

– কাল বিকেলে ফ্রি আছিস? তাহলে তোকে নিয়ে যাব একজনের কাছে।

(৩)

পরের দিন বিকেলে আর একটা ছাত্রের বাড়িতে শরীর খারাপের অজুহাতে ছুটি নিয়ে গেলাম সুবলের সঙ্গে। সুবল আমাকে গলি গলি তস্য গলি দিয়ে নিয়ে গেল একটা বেড়ার ঘরের সামনে! এখানে আবার কি ধরনের চাকরি? আমার বুক ঢিপ ঢিপ করতে লাগল! সুবল আস্তে আস্তে ডাকল,

– হাসান ভাই। ও হাসান ভাই?

বেড়ার ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো একজন মাঝবয়সী লোক। দাড়িওলা, আধ ময়লা পাজামা পাঞ্জাবী পড়া লোকটা যেন আমাকে কিছুক্ষণ ধরে মাপল তারপর সুবলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

– এ কে?

– ওর নাম দীপক। আমার ছোটবেলার বন্ধু, খুব চেনা!

এবার লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

– কাজ চাই?  এসো আমার সাথে।

আগে আগে চলল লোকটা, পিছনে আমি আর সুবল। গলির পাশে বড় নর্দমা, নোংরায় ভর্তি। দুর্গন্ধে চারপাশ পূর্ণ। আমার তো বমি বমি পাচ্ছিল। হাসান ভাই নামের লোকটা একটা ইঁটগাঁথা ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। বারান্দায় উঠে দরজার কড়া নেড়ে ডাকল, “রহিম ভাই।”

কেউ যেন ভিতর থেকে সাড়া দিল।

তারপর দরজা খুলে বেরিয়ে এল একটা লোক, বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। চেহারাটা বেশ সুন্দর, ফিল্মি হিরোর মত। পড়ণে টি-শার্ট আর প্যান্ট। আমায় আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে হাসানকে জিজ্ঞেস করল, “চেনা?”

– সুবলের বচপন কা দোস্ত।

রহিম ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

– অন্দর আইয়ে।

সবাই মিলে ভেতরে ঢুকলাম। একটা ঘরে অল্প আলো জ্বলছে। দেওয়াল ঘেষে একটা প্লাস্টিকের টেবিল আর চারটে চেয়ার, সবগুলোই প্লাস্টিকের।

সবাই চেয়ার টেনে বসল। রহিম ভাই বলল,

– আমাদের দলে কাজ করতে হলে খুব বিশ্বাসী লোকের দরকার। তাই তুমি পরিচিত কিনা সেটা জানা জরুরী ছিল। তুমি এখন কি করো?

–  টিউশনি।

– মাসে কত হয়?

– হাজার ছয়েক।

– আমাদের এই কাজ ঠিক মতো করে দিতে পারলে অনেক বেশী রোজগার করতে পারবে। তবে রিস্ক আছে খুব! ধরা পড়ে গেলে কিছু করার থাকে না। আমরাও তখন তোমাকে আর চিনব না!

– কাজটা কি?

– মাল সাপ্লাই। হাসান তোমাকে একটা ব্যাগ দেবে আর একজনের ফোন নাম্বার দিয়ে দেবে। তুমি সেটা তাকে দিয়ে আসবে। সন্ধ্যেবেলায় আমার কাছ থেকে পেমেন্ট পাবে – ক্যাশে। ব্যস্। এই শুধু কাজ।

– রোজ কত করে পাব?

– মালের ভল্যুমের ওপর নির্ভর করছে। তবে মোটামুটি হাজার টাকা প্রতিদিনই পাবে।

মনে মনে হিসাব করে দেখলাম মাসে তিরিশ হাজার টাকা! একটা ভালো মাইনের চাকরির মতো, মন্দ কি! কিন্তু রিস্ক আছে বলছে! সে তো থাকবেই!

– ঠিক আছে। আমি রাজি।

– তাহলে কাল থেকেই শুরু করে দাও।

(৪)

বাড়িতে বললাম আমি একটা ভালো চাকরি পেয়ে গেছি। শুনে বাবার তো আনন্দ আর ধরে না! তক্ষুণি দিদিকে ফোন করে জানাতে যাচ্ছিল। আমিই বারণ করলাম। মা তো শুনে আনন্দে কাঁদতে রইল। কত ঠাকুর দেবতার কাছে মানত করে রেখেছে, তাদের পূজো দিতে হবে – গড় গড় করে তার লিস্ট বলে চলল। আমি ছাত্রদের বললাম, এখন থেকে আর সকালে টিউশন করতে পারব না। শুধু সন্ধ্যেবেলায় পড়াব। কয়েকটা টিউশন বাবলুকে দিয়ে দিলাম, ও একেবারে কৃতার্থ হয়ে গেল! আমি ওর কাছে হিরো হয়ে গেলাম!

পরের দিন সকালে অফিসের বাবুদের মতো করে সেজেগুজে কাঁধে ভালো ব্যাগ নিয়ে পালিশ করা জুতো পড়ে মা-বাবাকে প্রণাম করে বেরিয়ে পরলাম। মনের ভেতর কেমন কেমন একটা লাগছিল! মনে হচ্ছিল বাবা-মাকে বোধহয় ঠকানো হ’ল। পরক্ষণেই সেই চিন্তাটাকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিলাম। এই কাজে বিবেক থাকলে চলবে না। ঐ হাসান ভাইয়ের কথা মতো আমি বাসে চড়ে হাওড়া গেলাম। বাসে বসেই হাসান ভাই-এর দেওয়া ফোন নম্বরে ফোন করে ছিলাম। সে আমাকে সাবওয়ের মধ্যে চলে যেতে বলেছিল। সাবওয়ের ভিতর দিয়ে হাঁটার সময় একটা লোক হুড়মুড়িয়ে আমার গায়ে এসে পড়ে বলল, “সরি”। তারপর খুব আস্তে বলল,” ৭০৮? ” ওটা আমার কোড। আমি হ্যাঁ বলতেই লোকটা বললো, “গাব্বু ৮০!” ওটাও কোড ল্যাঙ্গুয়েজ | লোকটার হাতে ছোট্ট একটা চামড়ার ব্যাগ দিতেই সে নিমেষে সেটা পকেটে চালান করে দিল। ব্যস্, আমার আজকের মতো কাজ শেষ। সারাদিন এদিক সেদিক ঘুরে বিকাল বেলা বাড়ি ফিরে এলাম।

মা জিজ্ঞেস করল, ” এত তাড়াতাড়ি ছুটি দিয়ে দিল? ”

আমি বললাম, ” প্রথম দিন তো তাই! ”

মনে মনে ভাবলাম কাল থেকে আর একটু দেরী করেই ফিরব।

সন্ধ্যেবেলায় হাসান ভাইয়ের সাথে রহিম ভাইয়ের কাছে গেলাম পেমেন্ট নিতে | হাজার টাকার একটা নোট আমাকে দিলো ! যাক, কথা রেখেছে | ফেরার সময়ে পরের দিনের জন্য আবার একটা ছোট কালো ব্যাগ দিয়ে দিলো, চেন টানা | আমি পকেটে পুড়ে নিলাম |

– খুলে দেখবে না কিন্তু !

– নাঃ

ফিরে এসে আমার অফিস ব্যাগে ভরে রাখলাম | মা রাত্রে খেতে দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করলো, “হ্যাঁ রে, অফিসটা কেমনরে ?” আমার বিষম লেগে গেলো ! বাবা মায়ের উপরে রেগে গিয়ে বললো, “একটু পরে জিজ্ঞাসা করলে হতো না ? খাবার সময়েই জিজ্ঞাসা করতে হয় ?” এই বলে আমার পিঠে হাত বোলাতে লাগলো | মা অপ্রস্তুত হয়ে বললো, “এরকম হবে আমি কি করে জানবো !”

তারপর “ষাট ষাট” বলে আমার মাথায় ফুঁ দিতে লাগলো | অনেক্ষন কাশির পর ঠিক হলাম আমি | জল খেলাম | আমার খাওয়া প্রায় হয়ে গিয়েছিলো, উঠে পড়লাম তাড়াতাড়ি |

বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলাম, কতদিন এভাবে আমাকে মিথ্যে কথা বলে যেতে হবে ? নানা কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম | স্বপ্নে দেখলাম, আমি এই কাজ করেই একটা ফ্লাট কিনেছি, গাড়ি কিনেছি, মা আর  দিদিকে অনেক গয়না আর ভালো ভালো শাড়ি কিনে দিয়েছি | বাবাকে একটা রেস্টুরেন্ট করে দিয়েছি ইত্যাদি ইত্যাদি | ঘুম ভেঙ্গে যেতেই দেখলাম ঘরে নীল আলো জ্বলছে, এখন অনেক রাত – মোবাইলে দেখলাম রাত্রি দুটো বাজে | ঘরের ভিতরটা ভীষণ গরম লাগছিলো, বাইরে এলাম – বাবা-মায়ের ঘরে তখনও আলো জ্বলছিল | পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেলাম মা শার্টের বোতাম বসাচ্ছে | পুজো আসছে, এখন সেলাইয়ের কাজের চাপ আছে খুব | রাত্রে সেলাই মেশিনে কাজ করে না, তাহলে আমরা ঘুমোতে পারবো না | তাই, মা এখন বোতাম বসানোর কাজগুলো করছে | আগে এই ফলস পাড় সেলাই, বোতাম বসানোর কাজগুলো দিদি করতো, এখন মাকে নিজেই করতে হয় | সেলাইয়ের কাজ করে করে মাকে চশমা নিতে হয়েছে, চোখের নিচেও গাঢ় কালি পড়েছে |

আমি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম | হিমেল হাওয়ায় শরীরটা যেন জুড়িয়ে গেলো | আকাশে অনেক তারা | দূরের বড় রাস্তা দিয়ে লরি যাচ্ছে হুশ হুশ করে | মোড়ের মাথার ধাবায় কেউ কাওয়ালি গান ধরেছে ! বেশ লাগছিলো শুনতে ! আবার ঘরে এসে শু’লাম – কিন্তু ঘুম আসছিলো না ! একটা পাপবোধ মনের মধ্যে কুরে কুরে খাচ্ছিলো !

(৫)

সকালে আবার যথারীতি স্নান করে ভাত খেয়ে অফিস যাওয়ার নাম করে বেরিয়ে পড়লাম | আজ যাদবপুর যেতে হবে | সবাই জানে আমি সেলস-এর কাজ পেয়েছি, বড় কোম্পানি, তবে ঘুরে ঘুরে কাজ করতে হয় | প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের একটা শপিং মলের কাছে গিয়ে বাস থেকে নামলাম | শপিং মলের বাইরে অনেক খাবারের দোকান, একটা দোকানে ডিম্ টোস্ট আর চায়ের অর্ডার দিয়ে মোবাইলের দিকে তাকালাম – মেসেজ এসেছে, “এসে গেছি”| তাকিয়ে দেখলাম, প্রথমে লোকটা কে বুঝে উঠতে পারলাম না, তাই রিং করলাম | পাশের একটা পান-সিগারেটের দোকানের সামনে একজনের মোবাইলে বেজে উঠলো, “হ্যালো ?”

ওই কালো জামা পড়া লোকটাই মনে হচ্ছে !

– দাদা, একটা সিগারেট দেবেন ? গোল্ড ফ্লেক |

মুখ নিচু করে সিগারেটটা ধরাতে যাবো, কেউ কানের কাছে খুব আস্তে করে বললো, “৭০৮?”

আর একটু হলেই আমার মুখ থেকে সিগারেটটা পরে যেত ! আমি মুখ তুলে দেখলাম একটা সাদা জামা পড়া বেঁটে মতো লোক আমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে | কুতকুতে চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে |

– গাব্বু ৩২ ?

– হ্যাঁ |

নিমেষে ব্যাগ হস্তান্তর হয়ে গেলো | কেউ কিছু টেরই পেলো না | আমার শিরদাঁড়া দিয়ে যেন হিমস্রোত বয়ে গেলো | মনে হলো, ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো এতক্ষনে ! শপিং মলে ঢুকে পড়লাম – ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম দোকানগুলো | জিনিসের কি আকাশ ছোঁয়া দাম ! কারা কেনে এসব ? ভাবছিলাম, হটাত দেখি একজন ভরমহিলা একটা জামাকাপড়ের দোকানে ঢুকলেন, আরে একে তো চিনি ! কি নাম যেন, ও হো, এ তো পায়েল, “গঙ্গা তীর্থ” সিরিয়ালে অভিনয় করে ! বাহ্ ! মাকে গিয়ে বলতে হবে ! মা ওই সিরিয়ালটা খুব দেখে, তবে এখন বোধহয় পুজোর কাজের চাপে সময় পাচ্ছে না |

ফেরার সময়ে 37A বাসে উঠলাম | বাসটা তক্ষুনি ছাড়বে, সিট প্রায়  হয়ে গেছে | আমি অবশ্য বসার জায়গা পেলাম | ধর্মতলাতেই নেমে যাবো | গড়িয়াহাট থেকে একটা ছেলে বাসে উঠে আমার সামনে দাঁড়ালো | হটাত দেখি ছেলেটা পকেট থেকে একটা দশটাকার নোট বের করে কন্ডাক্টরকে দিলো | কন্ডাক্টর যাত্রী তুলতেই ব্যস্ত, টিকিট দেয় নি এখনো | কিছুক্ষন যাওয়ার পরে কন্ডাক্টর যেই টিকিট দিতে এলো, ছেলেটা বললো, “আরে আপনি দু’টাকা ফেরত দিচ্ছেন কেন ? আমি তো একশো টাকা দিয়েছি ! বাকি নব্বই টাকা ফেরত দিন !”

কন্ডাক্টর হতভম্ব হয়ে বললো, “কি একশো টাকা দিয়েছেন ? আপনি তো দশ টাকা দিলেন !”

– মামার বাড়ি ? আমি দশ টাকা দিয়েছি ? আমি একশো টাকা দিয়েছি ! কে দশ টাকা দিয়েছে ! আর আপনি আমার ঘরে চড়িয়ে দিচ্ছেন ? এই জন্যই টিকিট দিতে দেরি করছিলেন !

ছেলেটার সাথে কন্ডাক্টরের বচসা বেঁধে গেলো | ছেলেটির ভদ্র পোশাক, নিখুঁতভাবে কামানো দাড়ি-গোঁফ দেখে সবাই ওর কথাই ঠিক ভাবতে লাগলো, সবাই ওর পক্ষই নিয়ে নিলো | কেউ কেউ বললো, “আরে দাদা, টাকাটা দিয়ে দিন না ! উনি কি ভুল বলছেন ? আপনি হয়তো ভুলে গেছেন ! ভদ্রঘরের ছেলেরা কি ভুল বলবে ?”

কন্ডাক্টর অনেক্ষন তর্ক চালিয়ে যাওয়ার পর বাধ্য হয়ে নব্বই টাকা ফেরত দিলো | আমি চুপ করে রইলাম | ছেলেটার বুদ্ধি দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম ! ধর্মতলায় বাস থেকে নেমে দেখি ছেলেটাও বাস থেকে নেমেছে | আমার সাথে চোখাচোখি হতেই বললো, “থ্যাংক ইউ দাদা ! আমি ভেবেছিলাম, আপনি হয়তো বলে দেবেন ! থ্যাংক ইউ এগেইন !”

– এই কাজ করো কেন ?

– উপায় নেই বলে !

ছেলেটার স্মার্ট উত্তর | অন্য কাজ করো না কেন ?

– কি কাজ করবো ? চাকরি পাই নি ! ভিক্ষে ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না আমার ! অথচ আমি একজন বি.কম. গ্রাজুয়েট !

আমিও বি.কম. গ্রাজুয়েট সেকথা আর ওকে বললাম না | শুধু পিঠে একটা হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়ে মিলিয়ে গেলাম জনারণ্যে !

(৬)

বাড়ি ফেরার সময়ে দেখি পাড়ার কতগুলো ছেলে হাতে বিলবই নিয়ে এগিয়ে এলো আমার সামনে |

– দিপুদা, তুমি ভালো চাকরি পেয়েছো শুনলাম ! তোমাকে এবারে পাঁচশো টাকা চাঁদা দিতেই হবে !

– এই পাঁচশো টাকাটা খুব বেশি হয়ে যাচ্ছে না ? তোরা দুশো টাকা নে !

– না না, হবেই না ! তোমাকে পাঁচশই দিতে হবে !

সবাই মিলে ঘিরে ধরলো আমাকে |

– আচ্ছা, আচ্ছা, তাই দেব ! এখন ছাড় আমাকে | দেখছিস না, অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরছি !

ছেলেগুলো চলে যেতেই আমি বড় করে একটা স্বাস নিলাম !

আগামীকাল মহালয়া | রাত্রে হিসাব-নিকেশ বুঝে নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় রেডিওর জন্য দুটো ব্যাটারি কিনে আনলাম | রাত্রে শোয়ার সময় রেডিওতে ব্যাটারি ভরলাম | ভোরবেলায় আমার কোনোদিনই ঘুম ভাঙতে চায় না, আজ মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়ে রাখলাম |

খুব ভোরবেলায় কখন অ্যালার্ম বেজেছে শুনতেই পাই নি | মা তবু আমাকে ডেকে দেওয়াতে তাড়াতাড়ি উঠে রেডিও চালালাম – তারপর আবার মশারির মধ্যে শুয়ে পড়লাম | আধো ঘুম, আধো জাগরণে শুনলাম মহালয়া | সাড়ে সাতটা নাগাদ উঠে দাঁত মেজে চা খেলাম, তারপর স্নান করতে গেলাম | মা আজকে পনিরের তরকারি আর লুচি খেতে দিলো |

– আজ লুচি কেন মা ?

– মহালয়া তো তাই নিরামিষ খাওয়া হবে আজ |

গরম ফুলকো ফুলকো লুচির স্বাদ বহুদিন বাদে পেলাম ! আমি প্রায় গোটা দশেক খেয়ে নিলাম |

– মা, আজ বিকেলে পুজো মার্কেটিং করতে যাবো ! তুমি দিদিকে আসতে বলে দিও |

– ঠিক আছে, দুগ্গা দুগ্গা, তুই তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস |

আমি ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম | আজ আবার দু’জায়গায় মাল ডেলিভারি দিতে হবে | কাল হাসান দা বলেছে আমাদের আরো সাবধানে কাজ করতে হবে, পুলিশ খুব নজর রাখতে শুরু করেছে !

(৭)

শিয়ালদা স্টেশনে অফিস টাইম-এর ভীড়, আমি একটা খবরের কাগজ কিনলাম | তারপর ফোনে নির্দিষ্ট পান-সিগারেটের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলাম | বেশ কিছু উর্দি পড়া পুলিশ চারিদিকে ঘুরছে | হয়তো প্লেন ড্রেস-এও আছে | ওদের নজর এড়িয়ে ব্যাগ দেওয়াটাও কঠিন ! আমি একটু অন্যদিকে যাবো ভাবছিলাম, এগিয়ে গেলাম প্লাটফর্মের বাইরের দিকে | ভীড়ে মিশে থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ | হটাত আমার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো, মাথা নিচু করে ফোনটার দিকে তাকালাম,

ঠিক তখনি পাশ থেকে কেউ বলে উঠলো, “৭০৮ ?” সবুজ চেক চেক জামা পড়া লোকটা যেন আমার পাশে মাটি ফুঁড়ে উঠেছে ! “হ্যাঁ” বলতেই নিচু স্বরে বললো, “গাব্বু ২৫” | খবরের কাগজের আড়ালে হয়ে গেলো ব্যাগ হস্তান্তর !

আমি যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে এসে বড়রাস্তায় দাঁড়ালাম বাসের জন্য | চারিদিকে থিক থিকে ভিড়, সবাই বাস ধরার জন্য দৌড়াচ্ছে | আমিও দাঁড়িয়ে আছি, আমাকে এখন প্রিন্সেপ ঘাট যেতে হবে | হটাত নজর পড়লো একটা লোক, কালো শার্ট পড়া আমার দিকে তাকিয়ে আছে ! চোখাচোখি হতেই মুখ ঘুরিয়ে নিলো | লোকটার হাতে একটা জ্বলন্ত সিগারেট | আমার বুকটা কেমন ঢিপ ঢিপ করে উঠলো ! পুলিশের লোক নয় তো ?

একটা 3A বাস আসতেই আমি উঠে পড়লাম | গাদাগাদি ভীড় ছিল বাসে | প্রথমে পাদানিতে পা রেখেই উঠে পড়লাম, তারপরে একটু একটু করে এগিয়ে ভিতরে ঢুকলাম | ওমা, কালো শার্ট পড়া লোকটাও এই বাসে উঠেছে ! কি করি ? নেমে যাবো ? নাহঃ, তাহলে আরো সন্দেহ করতে পারে | দেখি, কি করা যায় ! কন্ডাক্টর টিকিট চাইলো, শুধু বললাম, “দিচ্ছি” | আমার ডেস্টিনেশনটা জানিয়ে লাভ নেই | নামার সময় দেব | স্ট্র্যান্ড রোড আসতেই নেমে পড়লাম, তারপর মিলেনিয়াম পার্কে ঢুকে পড়লাম | ওখানে গিয়ে ফোন করতেই ওদিক থেকে কেউ বললো, “আপ কো তো প্রিন্সেপ ঘাট আনে কে বাত থা !”

– পুলিশ বাস মে চর গিয়া থা | ইসি লিয়ে মায় এহি উতরা |

– ঠিক হ্যায়, আপ উঁহাপে রোকিয়ে, ম্যায় আ রহা |

এখন এই সকালবেলায় এখানে ভীড় ছিল না |  দু’চারজন জোড়ায় জোড়ায় এদিকে ওদিকে বসে আছে |  আমি গঙ্গার ধার ঘেঁষে একজায়গায় বসে পড়লাম | একটু পরেই একটা বাদামওলা আমার কাছে এসে “বাদাম, বাদাম” করে হাঁকতে লাগলো | বিরক্ত লাগছিলো ! এখন আমার বাদাম খাওয়ার ইচ্ছা নেই – কিন্তু বাদামওলা আমার আরো কাছে এসে বললো, “৭০৮ ?” আমি হকচকিয়ে গিয়েছিলাম ! আমার মুখ দেখে সে কি ভাবলো জানি না, শুধু মুচকি হাসলো | বাদামওলা আরো গলা নামিয়ে বললো, “গাব্বু বিশ” | তারপর গলার ভলিউম বাড়িয়ে বললো, “বাবু, বিশ রুপিয়া কা বানাই ?” আমি হ্যাঁ বললাম, চারিদিকে তাকিয়ে সে আমাকে একটা এক্সট্রা ঠোঙা দিলো, আমি তার নিচে ছোট্ট ব্যাগ চালান করে দিলাম | বাদামওলা আমাকে বাদাম দিয়ে টাকা নিয়ে চলে গেলো | একজন সিকিউরিটিকে এবারে এদিকে হেঁটে আস্তে দেখা গেলো | আমি বাদামের শেষ মাখাটা মুখে পুড়ে দিয়ে ঠোঙাটা ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে দিয়ে রুমালে মুখ মুছে বাইরে বেরিয়ে এলাম | ভাবছিলাম, এবারে কি করবো ?

একবার ইচ্ছা হলো বেলুড়মঠ চলে যাই | সকালেই তো কাজ মিটে গেলো | এখন সন্ধ্যে পর্যন্ত অফুরন্ত সময় ! চলে গেলাম বেলুড়মঠেই | সারাদিন এদিক সেদিক ঘুরে আবার সন্ধ্যে বেলায় বাড়ি ফিরে মা আর দিদিকে নিয়ে পুজো শপিং করতে গেলাম | এই প্রথম ওরা দুজনে মনের মতো করে শপিং করলো | রাত্রি ন’টার সময়ে ওদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আমি রহিম ভাইয়ের কাছে গেলাম |

রহিম ভাই আজকে জিজ্ঞাসা করলো, “কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো ?” আমি সকালের সেই কালো শার্ট পড়া লোকটার কথা বললাম | রহিম ভাই ব্যাপারটা উড়িয়ে না দিয়ে বললো, “দু’চার দিন রুট পাল্টাও তবে | না হলে কলকাতার বাইরে কোথাও চলে যাও | হাসান সব ব্যবস্থা করে দেবে |”

(৮)

বাড়ি ফিরে দেখলাম মা আর দিদি মিলে আজ অনেক কিছু ভালো খাবার বানিয়েছে ! ভাত, সোনা মুগের ডাল, ঝুরঝুরে আলুভাজা, পনির-আলুর দম, ধোঁকার ডালনা, চাটনি ! ইলাহী ব্যাপার ! আমরা চারজনে খুব মজা আর আনন্দ করে খেলাম ! বহুদিন বাদে দিদি আমাদের বাড়িতে এলো | জামাইবাবু দিদিকে পৌঁছে দিয়েই চলে গেছে | আজ রাতে দিদি থাকবে, কাল বাবা গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসবে | মা আর দিদির শাড়ি খুব পছন্দ হয়েছে ! ওরা বার বার প্যাকেট থেকে বের করে দেখছে ! বাবার জন্যও ধুতি-পাঞ্জাবী কিনেছি | জামাইবাবু, দিদির শ্বাশুড়ি, ননদ আর দিদির শ্বশুরের জন্যও জামাকাপড় কেনা হয়েছে | বিয়ের প্রথম বছর, না দিলে নিন্দে হবে !

অনেক রাত অবধি জেগে দিদি আর আমি গল্প করলাম | মাও অনেক্ষন জেগে ছিল, তারপর শুয়ে পড়লো | দিদির দুঃখের ইতিহাস শুনে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিলো | সব মেয়েদেরই শ্বশুর বাড়ি গিয়ে দুঃখ পেতে হয়, এই ভেবে মনকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম | দিদি শুতে যাওয়ার পর আমিও শুয়ে পড়ব ভাবছিলাম। হটাত মনে পড়লো আমার প্যান্টের পকেটে যে ছোট্ট চামড়ার ব্যাগটা আছে ওটাকে সাবধানে বড় ব্যাগে মানে আমার অফিসের ব্যাগে ভরে রাখতে হবে। বিছানা থেকে উঠে গিয়ে প্যান্টের পকেট থেকে ছোট ব্যাগটা বের করলাম। ব্যাগে কি আছে তা আমাদের দেখা বারণ, কিন্তু এখানে আর কে দেখতে আসছে? দরজার ছিটকিনিটা বন্ধ করে দিয়ে বিছানায় বসে খুব সাবধানে ব্যাগটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলাম। সাধারণ একটা মেয়েদের পার্শের মতই। ব্যাগের চেনটা খুব সাবধানে একটু খুলে দেখলাম ভেতরে কয়েকটা ছোট্ট ছোট্ট প্যাকেট রয়েছে, তাতে সাদা গুঁড়ো ভর্তি। নিশ্চয়ই কোন মাদক জাতীয় জিনিস হবে। আমি তাড়াতাড়ি ব্যাগটা বন্ধ করে বড় ব্যাগে রেখে দিলাম।

(৯)

আজ আমাকে রুট পাল্টাতে হবে, ভাবছিলাম কলকাতা ছেড়ে অন্য কোনোদিকে চলে যাবো | ফোনে জানলাম, আজ  যাকে ব্যাগটা দিতে হবে সে থাকে উত্তরপাড়ায় | ভালোই হলো ! খেয়া পেরিয়ে স্টেশনে গেলাম রিক্সায় চড়ে | লোকাল ট্রেনের প্যাসেন্জারদের ভীষণ ভীড়, ট্রেন আসতেই সব হুড়মুড় করে উঠে পড়লো | আমার পাশেই একজন উঠলো সাদা, কালো শার্ট-প্যান্ট পরে | ভেবেছিলাম উকিল হবে বোধহয় | ভেন্ডারের পরের কম্পার্টমেন্টেই আমি উঠেছি ক্লায়েন্টের কথা মতো ! আমরা যাদের মাল সাপ্লাই দিই তারা আমাদের ক্লায়েন্ট | সাদা কালো পোশাক পড়া লোকটি আমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বললো, “উঃ আজ কি গরম !” তারপর খুব আস্তে জিজ্ঞাসা করলো, “৭০৮?” আমি “হ্যাঁ” বলতেই বললো, “গাব্বু ৪০৩” | ভিড়ের মধ্যে ব্যাগ হাতবদল হয়ে গেলো | আমি আগে থেকেই জানতাম সাদা-কালো পোশাকে গাব্বু ৪০৩ বলে কেউ আমার কাছ থেকে ব্যাগ নেবে, কিন্তু প্রথমে লোকটাকে উকিল বলে ভুল করেছিলাম | একটা জিনিস কিছুতেই আমি বুঝে উঠতে পারছি না, কিভাবে এরা আমাকে ট্রেস করছে ! ব্যাপারটা নিয়ে কারো সাথে আলোচনাও করতে পারছি না |

একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি, সুবল আমাকে এখন এড়িয়ে চলে | রহিম ভাই বা হাসান ভাই সম্পর্কে কিংবা আমাদের কাজের বিষয়ে কোনো আলোচনা করতে গেলে অন্য প্রসঙ্গে চলে যায় | আমার মনে হচ্ছে, সুবল আমাকে ওদের কাছে নিয়ে গিয়েছিলো শুধু কমিশন পাওয়ার লোভে | সেটা পেয়ে গেছে, ব্যাস | বিশ্বাসী লোক জুটিয়ে দেওয়াই ওর কাজ | হাসান হচ্ছে, রহিম ভাই আমার আমার মতো যারা আছে তাদের মধ্যে এজেন্ট-এর কাজ করে | হাসানই প্রতিদিন সকালে আমাকে বলে দেয় আজ কোথায় যেতে হবে, কত নম্বর ক্লায়েন্ট আমার কাছে আসবে ইত্যাদি ইত্যাদি | প্রতিদিন ও আমাকে আলাদা আলাদা ফোন নম্বর থেকে ফোন করে, ওর কাছে কতগুলো ফোন আর সিম আছে তা জানি না | আজ পর্যন্ত একটা ফোন থেকে দু’বারের বেশি ফোন করে নি | মনে হয় রহিম ভাই বেশ বড়মাপের এজেন্ট – ড্রাগ পাচারের ব্যাপারে সে সিদ্ধহস্ত – তবে ওর থেকেও বড়মাথা কে বা কারা আছে তা এখনো জেনে উঠতে পারি নি |

(১০)

প্রায় দিন পনেরো হতে চললো আমি নতুন পেশায় যোগ দিয়েছি | এই ক’দিনে আমার রোজগার মন্দ হয় নি – প্রায় ষোল-সতেরো হাজার টাকা আমার পকেটস্থ হয়েছে | কিন্তু মনে একটা পাপবোধ, অন্যায় বোধ আমাকে মাঝে মধ্যেই কুরে কুরে খায় ! সেটা থেকে বেরিয়ে আস্তে পারছিনা কোনো মতেই | গতকাল “থলি” মানে ব্যাগ নেওয়ার পর হাসান ভাই বলছিলো, “পুজোর সময় ধান্দা করা বেশ সুবিধা | এখন শুধু ভিড়ের মধ্যে মিশে থাকলেই হলো | তবু সাবধানে থাকা ভালো |” কোথাও কোনো সমস্যা দেখলেই যেন গা ঢাকা দিই, পরে ফোন করি হাসান ভাইকে |

আজ ষষ্ঠী, সকালবেলায় মা পাড়ার পুজোপ্যান্ডালে গিয়ে পুজো দিয়ে এসেছে আমার আর দিদির নামে | আজকে বাড়িতে লুচি, ছোলার ডাল, কুমড়োরতরকারী | বাবা আজ সকালে আমাকে পাঁচশো টাকা দিয়ে বলেছে, “তোর ইচ্ছামতো কিছু কিনে নিস্ |” আমি একটা টি-শার্ট পাড়ার দোকান থেকে কিনে এনেছি | মায়ের খুব পছন্দ হয়েছে ! আজকে ওটা পরেই কাজে বেরোবো |

(১১)

হাতিবাগানে বাস থেকে নেমে দেখলাম বেজায় ভীড়, এখনো কেনাকাটা চলছে পুরোদস্তুর | আমি ক্রেতাদের ভীড়ে মিশে রইলাম, নিজেও দামদস্তুর করলাম টুকিটাকি জিনিসপত্রের | একটা বেডসীট কিনলাম, দুটো মাথার বালিশের কভার | হাতে নতুন প্যাকেট ঝুলিয়ে হাঁটতে লাগলাম স্টার থিয়েটারের দিকে | অনেক রাস্তা, ভীড়ে মিশে মিশে হাঁটছিলাম | হঠাত ফোন এলো – ক্লায়েন্ট দাঁড়িয়ে আছে খাদিমের সামনে | আমি একটু জোরে হাঁটতে লাগলাম, একজনের সাথে একটু ধাক্কা হয়ে গেলো, সে কটমট করে আমাকে দেখলো | আমি যততাড়াতাড়ি “থলি” সাপ্লাই করতে পারলে বাঁচি | ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়বে আমার ! খাদিমের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ফোনে নম্বরটা ডায়াল করতেই ভোজবাজির মতো একটা কালো লোক আমার গায়ের কাছে এসে বললো, “৭০৮?” “হ্যাঁ” বলতেই, “সে বললো, গাব্বু ৬৭” | ব্যাস, নতুন কেনা জিনিসের প্যাকেটের মধ্যে করে চালান হয়ে গেলো “থলি” ! আজকের মতো কাজ শেষ ! চলে আস্তে যাবো, হঠাত কি ভেবে পিছন ফিরে দেখি কালো লোকটা কোথায় মিলিয়ে গেছে ভিড়ের মধ্যে, কিন্তু একটা অন্য লোক তাকিয়ে আছে আমার দিকে, কোথায় দেখেছি ! ওহ, এ সেই শিয়ালদা স্টেশন-এর সামনে দাঁড়ানো লোকটা না ! কেমন যেন একটা হিমস্রোত আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নিচে নেমে গেলো ! তবে কি পুলিশ আমাকে ফলো করছে ? কিছু না ভেবে চটপট একটা ভীড় বসে উঠে পরলাম |

কন্ডাক্টর ভাড়া চাইতে এলো, আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি দেখে বললো, “কোথায় যাবেন ?”

– এই, মানে কলেজ স্ট্রিট |

আমি আমতা আমতা করে বললাম | একটা দশ টাকার নোট এগিয়ে দিলাম কন্ডাক্টরের দিকে | সে আমাকে চার টাকা ফেরত দিলো | কলেজ স্ট্রিট গিয়ে হাসানভাইকে একটা ফোন করলাম, বললাম, একটা লোক আমাকে ফলো করছে বলে মনে হচ্ছে ! হাসানভাই আমাকে চিন্তা করতে বারণ করলো | বললো, এখন কিছুক্ষন এদিক-সেদিক ঘুরে বাড়ি ফিরে যেতে | আর দু’চারদিন কাজ বন্ধ রাখতে হবে | সে আমাকে কলকাতার বাইরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে তাও বললো |

(১২)

মনে বেশ একটা দুশ্চিন্তা নিয়েই সন্ধ্যেবেলায় বাড়ি এলাম | বাড়ি ফিরেই হাতমুখ ধুয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম | মা জিজ্ঞাসা করলো, “কিরে কিছু খাবি না ?”

আমি বললাম, “এখন খুব ক্লান্ত লাগছে ! তুমি আমার টেবিলে ঢাকা দিয়ে রেখে যাও, আমি পরে খেয়ে নেবো |”

মা বললো, “আমি একটু পাড়ার প্যান্ডেলে যাচ্ছি | সাথে মোবাইলটাও নিয়ে যাচ্ছি, দরকার হলে ফোন করিস |”

মা চলে যেতেই দরজা বন্ধ করে, হাসানকে আবার ফোন করলাম | মন থেকে চাপটা কিছুতেই যাচ্ছে না ! সে আমাকে আবার চিন্তা করতে বারণ করলো | মায়ের রেখে যাওয়া লুচি, তরকারি ঠান্ডা হয়ে গেলো, আমার খেতে ইচ্ছাই করলো না | আমি অনেক চেষ্টা করেও সুবলকে ফোনে পেলাম না | আজ আর হাসানভাইয়ের সাথে দেখা করলাম না, রহিমভাইয়ের কাছে টাকা আনতেও গেলাম না | চুপচাপ শুয়ে থাকতে থাকতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না, হঠাত দরজায় কেউ ক্রমাগত ধাক্কা মারছিলো – আমি ঘুম চোখে উঠে বসলাম বিছানায় | মা ডাকছে, “খোকা ওঠ, খোকা ওঠ |”

দরজা খুলে বাইরে এলাম, “কি হয়েছে ?”

– তুই রাতের খাবার খাবি না নাকি ?

– ওঃ, তুমি খেতে দাও, আমি আসছি |

(১৩)

রাত্রে অনেক খারাপ ও আজব ধরণের স্বপ্ন দেখলাম | মনটা কিছুতেই চিন্তা মুক্ত হচ্ছে না | বাইরে বেরিয়ে বারান্দায় এলাম, পুজো প্যান্ডেলে ছেলেরা এখনো হৈ হৈ করছে | কেউ শিস দিলো উল্লাসে ! বোধহয় কেউ নাচ্ছে | আমি একটা সিগারেট ধরালাম | হঠাত বাবার কাশির আওয়াজ পেয়েই সিগারেটটা মুখ থেকে নামিয়ে হাতের তালুর আড়ালে লুকিয়ে ফেললাম | নাহঃ, বাবা ওঠে নি, ঘুমের ভেতরেই কাশলো |

বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতেই ভোর হয়ে গেলো | কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না | গায়ে রোদ পড়তেই ঘুমটা ভেঙে গেলো | মা বোধহয় ভেবেছে, আমার শরীর ভালো নেই, তাই ডাকে নি | কিন্তু ঘরের বাইরে বেরিয়ে মাকে কোথাও দেখতে পেলাম না | মা গেলো কোথায় ? আমি মুখ ধুয়ে রান্নাঘরে গিয়ে দেখলাম মা চা ঢাকা দিয়ে রেখে গেছে | ঠান্ডা হয়ে গেছে চা | আমি কাপ থেকে সসপ্যানে ঢেলে গ্যাস জ্বেলে গরম করে নিলাম | দুটো মেরি বিস্কুট দিয়ে প্রায় দু’চুমুকে শেষ করে দিলাম চা | খুব ক্ষিদে পেয়ে গিয়েছিলো | গতকাল রাতে ভালো করে খেতেই পারি নি ! সেই এক চিন্তাটা মনের ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছিলো | লোকটা কে আমাকে দেখছিলো, পুলিশ নয় তো ?

আমার চা খাওয়া শেষ হতে না হতেই মা বাড়ি ফিরলো |

– ওঃ, তুই উঠে পড়েছিস ? আমি একটু মণ্ডপে গিয়েছিলাম | কয়েকটা শিউলিফুলের মালা দিয়ে এলাম | আজ গাছে অনেক ফুল ফুটেছিলো ! এখন কিছু খাবি ?

– নাহঃ, আমি একটু প্যান্ডেল থেকে ঘুরে আসি মা |

– ওখানে তোর বন্ধুরা সবাই আছে, তোর কথা সকলেই জিজ্ঞাসা করছিলো |

– আমি যাচ্ছি |

(১৪)

মণ্ডপের সামনে যেতেই সবাই মাইল হৈ হৈ করে আমাকে ঘিরে ধরলো, “ওই তো দিপু এসে গেছে ! এসে গেছে !”

মোটা তপন, ন্যাড়া, শঙ্কু, নীলু, গাবলু, জয়, সুমন, অনিল, বেচু – সবাই ছিল | ওরা বললো, “তোকে আজ সন্ধ্যেবেলায় ধুনুচি নাচ নাচতে হবে কিন্তু !”

আমি বললাম, “আজ ছেড়ে দে !”

– না, না, না বললে শুনবো না কিছুতেই ! তুই আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো নাচতে পারিস ! তোকে নাচতেই হবে !

– আচ্ছা, আচ্ছা, দেখবোখন |

– না, না, দেখবোখন বললে শুনছি না ! তোকে নাচতেই হবে আজ সন্ধ্যেবেলায় !

আমি তখনকার মতো হ্যাঁ বলে দিলাম | মনে মনে ভাবলাম, দেখা যাক | যদি মন ভালো লাগে তাহলে নাচবো, নাহলে কিছু একটা বলে কাটিয়ে দেব |

সন্ধ্যেবেলায় দিদি এলো | আমাদের এখানে প্যান্ডেলে প্রতিবছর সপ্তমীর সন্ধ্যায় ছেলেদের ধুনুচি নাচ আর মেয়েদের শঙ্খ বাজানোর প্রতিযোগিতা হয় | তাই আজ দিদিও এসেছে | দিদিই আমাকে জোর করে মণ্ডপে নিয়ে গেলো | আমি ঢাকের তালে তালে আমার বেস্ট পারফর্মেন্স দেওয়ার চেষ্টা করলাম – সব্বাই খুব হাততালি দিলো | অনেকেই মোবাইল ছবি তুললো, ফেসবুকে আপলোড করলো | আর প্রতিযোগিতার শেষে আমি ফার্স্ট প্রাইজ হিসাবে একটা মিক্সি নিয়ে বাড়ি এলাম | দিদি শঙ্খ প্রতিযোগিতায় থার্ড হলো – ও পেলো একটা ননস্টিক ফ্রাইং প্যান | মা মিক্সিটাও দিদিকে দিয়ে দিতে চাচ্ছিলো – দিদি বললো, “না মা, এটা তোমার খুব কাজে লাগবে ! দিপু তোমাকে শিখিয়ে দেবে কিভাবে ব্যবহার করতে হয় |” রাত্রে আজ সর্ষে-ইলিশ আর গলদা চিংড়ির মালাইকারি রান্না হয়েছিল ! দিদি চিংড়ির মালাইকারিটা অসাধারণ রেঁধেছিলো ! মা, বাবা, দিদি আর আমি পাশাপাশি বসে খুব তাড়িয়ে তাড়িয়ে খেলাম ! রাত্রে অনেক্ষন গল্প করে তারপরে শুতে গেলাম |

(১৫)

আজ ভোরবেলাতেই ঘুম ভেঙে গেলো | মা আমার জন্য নতুন পাজামা-পাঞ্জাবি বের করে রেখেছিলো | আমাকে বললো, “তাড়াতাড়ি স্নান করে রেডি হয়ে নে, আটটার মধ্যে অঞ্জলি দিতে হবে !” আমি মুখ ধুয়ে স্নান করে পাঞ্জাবি পড়ে মণ্ডপে চলে গেলাম | পুরোহিত মশাই সবাইকে বললেন, “গঙ্গার জলে আচমন করে নিন | হাতে ফুল নিন | তারপর আমার সাথে বলুন,

ওঁ জয়ন্তি, মঙ্গলা, কালি, ভদ্রকালি, কপালিনি।

দূর্গা, শিবা, ক্ষমা, ধাত্রি, স্বাহা, স্বধা, নমোহস্তু তে॥

এষ সচন্দন গন্ধ পুস্প বিল্ব পত্রাঞ্জলিঃ, ওঁ হ্রীং দুর্গায়ৈ নমঃ॥

ফুলগুলো এই ঝুড়িতে দিন | কেউ ছুঁড়বেন না ! আবার হাতে ফুল নিন, বলুন –

ওঁ মহিসাগ্নি, মহামায়ে, চামুন্ডে, মুন্ডমালিনি।

আয়ুরারোগ্য বিজয়ং দেহি দেবি নমোহস্তু তে॥

এষ সচন্দন গন্ধ পুস্প বিল্ব পত্রাঞ্জলিঃ, ওঁ হ্রীং দুর্গায়ৈ নমঃ॥

ফুলগুলো এই ঝুড়িতে দিন | কেউ ছুঁড়বেন না ! আবার হাতে ফুল নিন, আর বলুন –

ওঁ সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে, শিবে, সর্বার্থসাধিকে।

শরণ্যে, ত্রামবকে গৌরী, নারায়নি নমোহস্তু তে॥

সৃষ্টিস্থিতি বিনাশানাং, শক্তিভূতে, সনাতনি।

গুণাশ্রয়ে, গুণময়ে, নারায়নি, নমোহস্তু তে॥

শরণাগত দীনার্ত পরিত্রাণ পরায়ণে।

সর্বস্যার্তিহরে, দেবি, নারায়নি, নমোহস্তু তে॥

ফুলগুলো ছুঁড়বেন না ! ঝুড়িতে দিন !”

আমরা সবাই পুরোহিত মহাশয়ের কথা মতো ফুলগুলো ঝুড়িতে দিয়ে প্রণাম করছিলাম, হঠাত সুবল কথা থেকে এসে সবাইকে ঠেলেঠুলে আমার কাছে এলো | ফিসফিস করে বললো, “দিপু পালা, বড়ো রাস্তার দিকে যাবি না একদম !”

সুবলের ঠেলেঠুলে ঢোকা আর আমার তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যাওয়া দেখে সবাই অবাক হলো ! আমি কিছু না ভেবেই একটা গলির মধ্যে দিয়ে স্টেশনের দিকে ছুটলাম | যদি আটটা পনেরোর লোকাল ট্রেনটা পেয়ে যাই | কিন্তু টিকিট কাটার সময় নেই | লোকাল ট্রেনটা আসছে, ওটাতে উঠতেই হবে | প্লাটফর্মে ট্রেনটা তখনও দাঁড়ায় নি | আমি লাফিয়েই উঠবো ভাবছিলাম, হঠাত কে যেন আমার কাঁধে হাত রাখলো ! বলা ভালো, সজোরে চেপে ধরলো আমার কাঁধ ! তাকিয়েই বুজলাম, এ পুলিশের চোখ ! পালাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পিঠে রিভলভারের নলের চাপ পেলাম ! আমাকে ওরা ঘিরে ধরেছে ! সাদা পোশাকের পুলিশ চারিদিক থেকে আমাকে ঘিরে ফেলেছে ! আমার আর চেষ্টা করা বৃথা ! ওরা আমাকে হ্যান্ডকাফ পড়িয়ে টানতে টানতে স্টেশনের বাইরে এনে জিপে তুললো ! লোকে লোকারণ্য স্টেশনের সবাই আমার দিকে তাকিয়ে ! লোকের গুঞ্জন কানে যাচ্ছিলো, কেউ কেউ বললো, “নিশ্চই দাগি আসামি !” আবার কেউ বললো, “এই বয়সেই এমন কাজ যে পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে !” নানাজনে নানা কথা বলতে লাগলো | জিপে উঠে দেখলাম হাসানভাই, সুবল ওরাও আছে | আরো দু’জন আছে যাদের চিনি না | জিপ আমাদের নিয়ে ছুটলো লালবাজারে |

জেরার পর জেরা, সারা রাত ধরে জেরা ! তবু মুখ খুলিনি | কারণ মুখ খুলেই মৃত্যু ! না খুললেও শারীরিক অত্যাচার ! জানি না, কি হবে শেষমেশ ! কালকে কোর্টে তুলবে |

(১৬)

আজকের একটি সংবাদপত্রের  এটাই শিরোনাম – “উত্তর ২৪ পরগনায় ধরা পড়লো ড্র্যাগ পাচারকারী !” সেখানে আমাদের কয়েকজনের ছবিও চাপা হয়েছে | নিশ্চই অন্য কাগজগুলোতেও এই খবর ছাপা হয়েছে !

জিপ থেকে নামিয়ে যখন আমাদের কোর্টরুমে নিয়ে যাচ্ছিলো, সেখানে মিডিয়ার লোকজনদের উপচে পড়া ভীড় | সবাই আমাদের ছবি তুলতে চেষ্টা করছিলো | হটাত কান্নার শব্দ পেয়ে দেখলাম মা অঝোরে কেঁদে চলেছে আর বলছে, “এ কি হলো ঠাকুর ! এ কি হলো ! ওরে খোকারে !” বাবার চোখ লাল ! দিদিও পাগলের মতো কাঁদছে ! পুলিশ আমাদের দাঁড়াতে দিলো না | সোজা ভেতরে নিয়ে গেলো |

জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১৫ দিনের রিমান্ড দিলো | আমাদের উকিল অনেক চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ইনভেস্টিগেটিং অফিসার-এর রিপোর্টে, সরকারপক্ষের উকিলের সওয়াল জবাবে আমরা দোষী সাব্যস্ত হ’লাম | আমার আর সুবলের সাত বছর এবং হাসান ভাইয়ের ১৪ বছরের জেল হলো |

একমাত্র রহিম ভাই পলাতক | তাকে খুঁজে পাওয়া যায় নি | দলের আরো দু-চারজন যারা ধরা পড়েছিল সকলেরই সাত বছর করে জেল হয়ে গেলো |

বাবা-মা-দিদি সবাই দেখা করতে এসেছিলো জেলে | আমি দেখা করিনি | কোনমুখে দাঁড়াবো ওদের সামনে ? আমি ওদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি ! নিজের লোভের সাজা পেয়েছি নিজেই ! নিজেই নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছি অবিরত !

জেলার ভদ্রলোক খুব ভালো মানুষ ! আমাকে কয়েকবার বলেছেন, “অতীতকে ভুলের জন্য তর্পন করো ! এই সংশোধনাগারে নিজেকে সংশোধন করে নিয়ে ফিরে যাও সমাজের মূল স্রোতে ! আবার নতুন করে বাঁচো !”

সত্যিই কি আবার নতুন করে বাঁচা সম্ভব ? সব কিছু কি আবার আগের মতো হবে ?

(সমাপ্ত)

[সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক ]

এক ঝলকে

কবি ফিরোজ আখতার -এর একটি কবিতা ‘নির্লিপ্ততা’

নির্লিপ্ততা আমি নির্লিপ্ত থাকি… পানকৌড়ি’র ক্লীব ডানায় ভর করে তারা আমায় বিষমাখানো নীল রং দিতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *